
নিজস্ব প্রতিনিধি: পরিবেশ সুরক্ষা ও সমাজসেবার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে সাতক্ষীরায় একচ্ছত্র ক্ষমতার রাজত্ব কায়েম করেছেন ‘প্রেরণা’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) পরিচালক শম্পা গোস্বামী ওরফে চ্যাটার্জী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সখ্যতা এবং স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় তিনি জড়িয়ে পড়েন জমি দখল, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং ভারত-বাংলাদেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রহণের মতো মারাত্মক অপরাধে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকায় তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী তার এনজিওর লাইসেন্স বাতিল, অবৈধ সম্পদের তদন্ত ও গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানিয়েছেন।
শিক্ষকতার আড়ালে ‘রূপবদল’ ও কালিগঞ্জ ছাড়ার পটভূমি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শম্পা গোস্বামীর স্বামী আনন্দ মোহন চ্যাটার্জী একটি কলেজের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন, যিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। অনেক তদবির ও যোগাযোগের পর তিনি তার স্ত্রীকে কালিগঞ্জ মোজাহার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই শম্পার বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকা-ের অভিযোগ উঠতে থাকে। এমনকি কচি স্যার বিয়ে করার পরও তার কারণে স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। স্থানীয় শালিস-বিচার ও নানা বিতর্কের পর তিনি শিক্ষকতা ছাড়তে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে তিনি এনজিও খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘প্রেরণা’ নামের একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হন। তবে তার বিতর্কিত কর্মকা- আরও বিস্তার লাভ করে। কালিগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসসহ মূল্যবান জমি দখল এবং সরকারি গাছ কেটে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাজা দিলেও অদৃশ্য প্রভাবে তাকে কারাগার ভোগ করতে হয়নি। একপর্যায়ে তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কালিগঞ্জে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহাদৎ হোসেন এবং বরেণ্য সাহিত্যিক ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান। তীব্র জনরোষের মুখে শম্পা গোস্বামী কালিগঞ্জ থেকে তার অফিস গুটিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় আস্তানা গাড়েন।
মুন্সিগঞ্জে ‘রঙ্গলীলা’ ও নাজমুল হুদার সহযোগী ভূমিকা:-শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বর্তমানে সেখানে থাকেন শম্পা গোস্বামী। স্থানীয়দের অভিযোগ, এনজিওর কাজের আড়ালে ওই বাড়িতে নিয়মিত অনৈতিক কর্মকা- বা ‘রঙ্গলীলা’ চলে।
লিপন ও শাহীনের সিন্ডিকেট: এর আগে সাতক্ষীরা কাস্টমস অফিস সংলগ্ন ‘প্রেরণা’র প্রধান কার্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে থাকতেন শম্পা। সেখানে লিপন নামের এক কর্মচারীর সাথে তার চলাফেরা,একই ভবনে রাতযাপন বিষয়টি চাউর হয়। সেই সময় অফিসের এক কর্মী শাহীন কক্ষের বাইরে পাহারাদারের (চৌকিদার) ভূমিকা পালন করতেন। চতুর শাহীন স্থানীয়দের কাছে দাবি করছেন, তার কাছে সব গোপন ডকুমেন্ট রয়েছে এবং তিনিই একদিন এই অফিসের প্রধান হবেন। পরবর্তীতে লিপন সঙ্গে শম্পার সম্পর্কের বিষয়টি শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় জানাজানি হলে জনরোষ থেকে বাঁচতে লিপন সাতক্ষীরা ছেড়ে পালিয়ে যান।
নাজমুল হুদা ও শিরিনা চক্র: – লিপন পালিয়ে যাওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হন নাজমুল ওরফে বেহায়া হুদা নামের অপর এক কর্মচারী। নাজমুল বর্তমানে নিজেকে ‘প্রেরণা’র প্রোগ্রাম প্রধান হিসেবে পরিচয় দিলেও মূলত তিনি শম্পা গোস্বামীর ব্যক্তিগত সহকারী। লিপন চলে যাওয়ার পরপরই নাজমুল সাতক্ষীরা শহরের মাঠপাড়ায় ভাড়াবাড়ি থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের রংপুরের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন এবং মুন্সিগঞ্জের ওই একতলা বাড়িতে শম্পা গোস্বামীর সাথে অবস্থান শুরু করেন। এই অনৈতিক কর্মকা-ের পাহারাদার হিসেবে কাজ করছেন শিরিনা নামের এক নারী কর্মী। এই নারী কর্মীর ভাই স্থানীয় ইউএনও এর গাড়ি চালক হওয়ায় তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন ও ক্ষোভ তৈরি হলেও শম্পা গোস্বামী এসবের তোয়াক্কা করছেন না।
ভারতের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ব্যাংকিং খতিয়ান:- আইন লঙ্ঘন করে শম্পা গোস্বামী ওরফে চ্যাটার্জী বাংলাদেশ ও ভারত-উভয় দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। ভারতে তার নামে আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড এবং ইনকাম ট্যাক্স কার্ডসহ সমস্ত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার বসিরহাট কলেজ শাখা পোস্ট অফিসে তার নামে তিনটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। অ্যাকাউন্টগুলোর বিবরণ নিচে দেওয়া হলো: কেভিপি (কিসান বিকাশ পত্র)৬৩৭২০৭৫১১২২৮ জুন ২০১৭ তারিখে খোলা। ২৯ জুন ২০১৭ তারিখে ১ লক্ষ রুপির ১০ বছর মেয়াদী ফিক্সড ডিপোজিট করা হয়, যার মেয়াদ শেষ হবে ২৮ জুন ২০২৭। আর (রিকারিং ডিপোজিট)৬৩৭১৯২১৫০৪ ও এসবি (সেভিংস ব্যাংক)৬৩৭১৫০০৯৪৫ শম্পা চ্যাটার্জী নামে সক্রিয়। এছাড়া শম্পা গোস্বামী ও তার মা অনিতা গোস্বামীর যৌথ নামে বসিরহাট পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (কলেজ শাখা) ১৫৮৭০১০০২৫৫০৪ নম্বর অ্যাকাউন্টটি পরিচালিত হচ্ছে। তিনি ভারতের বসিরহাট শহরের মির্জাপুর মৌজায় মায়ের নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং তার পাশেই ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে নিজের নামে ৮.২৬৪ শতক জমি কিনেছেন।
অনুসন্ধানের সূত্র: ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল পোস্ট অফিসের কেভিপি (৬৩৭২০৭৫১১২) অ্যাকাউন্ট বইটি হারিয়ে গেলে শম্পা গোস্বামী সশরীরে বসিরহাট থানায় হাজির হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যেখানে তার নিজস্ব স্বাক্ষর রয়েছে। তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট (নম্বর: অ০৮০৯৪৩০০) পরীক্ষা করলেই ২০১৭ সালের ২৯ জুন এবং ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল তার অবৈধভাবে ভারত সফর ও অবস্থানের সত্যতা প্রমাণিত হবে।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের অর্থ ও রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ ।বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শম্পা গোস্বামী ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে শাফি মোদ্দাছির খান জ্যোতির সঙ্গে তার গভীর ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শম্পা বিভিন্ন মহলে জ্যোতিকে তার ‘ব্যক্তিগত বন্ধু’ এবং তাদের যৌথ এনজিও প্রজেক্ট রয়েছে বলে বেড়াতেন।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি শম্পা গোস্বামীর দৃশ্যমান সম্পদ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। স্থানীয়দের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে জ্যোতির গচ্ছিত টাকা দিয়েই তিনি এই বিপুল সাম্রাজ্য গড়েছেন। মুন্সিগঞ্জে ২৬ কাঠা নিচু জমি কিনে তা মাটি ভরাট করেছেন। সেখানে কাঠ দিয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন ঘর, বাঁশ ও গোলপাতা দিয়ে পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট একটি শপিং সেন্টার এবং ৫ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে একটি বিশাল একতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এই নির্মাণযজ্ঞে ১ কোটি টাকারও বেশি খরচ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। এনজিও প্রজেক্টে নামমাত্র কাজ করে বিপুল টাকা আত্মসাৎ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে জ্যোতির অর্থেই তিনি বিলাশ বহুল জীবনযাপন করছেন। শম্পা গোস্বামী কোন বৈধ আয়ের উৎস নেই।
মেয়ের তথ্য গোপন ও ঢাকা বিইউপি-তে অবৈধ ভর্তি:-মায়ের পথ ধরে আইনলঙ্ঘনের আশ্রয় নিয়েছেন শম্পা গোস্বামীর বড় মেয়ে বৈশাখী চ্যাটার্জীও। ২০১৬ সালে সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর বৈশাখী কালীগঞ্জ নলতা খান বাহাদুর আহছানিয়া কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখান থেকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছাড়পত্র (টিসি) না নিয়ে, তথ্য গোপন করে ২০১৭ সালে ভারতের বসিরহাট শহরের ‘বসিরহাট রায়বাটী পঞ্চানন হাইস্কুল’-এ পুনরায় নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ২০১৮ সালে ওই ভারতীয় স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে কলকাতার ক্যানিং এলাকার একটি কলেজে ভর্তি হন।ভারতীয় ভিসা ও পাসপোর্ট রেকর্ড অনুযায়ী, ভারতে পড়াশোনাকালীন তিনি মাসের পর মাস ভারতে থাকতেন এবং মাঝেসাঝে বাংলাদেশে ২-৪ দিনের জন্য আসতেন। ভারতে পড়ালেখা শেষ না করে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের নলতা খান বাহাদুর আহছানিয়া কলেজে দীর্ঘ দুই বছর কোনো ক্লাস না করেই ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে যান। কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথমে আপত্তি করলেও, শম্পা গোস্বামীর প্রভাবশালী কথিত সাংবাদিক ‘দাদা’র দাপট ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কর্তৃপক্ষকে ফরম ফিলাপ করতে বাধ্য করেন।পরবর্তীতে ভারতে পড়াশোনার সমস্ত তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করে বৈশাখী চ্যাটার্জী মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি সেখানে ‘পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। দেশের একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও মর্যাদাপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে তথ্য গোপন করে ভর্তি হওয়া আইনত দ-নীয় অপরাধ। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তার ছাত্রত্ব অবিলম্বে বাতিলযোগ্য। তার পাসপোর্ট ও ভারতীয় ভিসা দেখলেই ভারতে লেখাপড়া ও অবস্থানের প্রমাণ মিলবে সহজে। তার ওই সময়ের পাসপোর্ট নম্বর বি ডাবলু ০৮৯৬৮৬৬ ও বিএ ০২৭৪২৯৬।
প্রজেক্ট থেকে অর্থ আত্মসাৎ:- নামমাত্র কাজ করে প্রজেক্ট থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, দ্বৈত নাগরিকত্ব, অর্থ পাচার ও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ শম্পা গোস্বামীর এনজিও ব্যুরোর রেজিস্ট্রেশন বাতিল, বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বাতিল এবং তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাতক্ষীরাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি :-আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে থানায় একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেছেন শম্পা গোস্বামী। করেছেন ধরাকে সরা জ্ঞান। বর্তমানে পরিবেশ সুরক্ষার নামে তিনি শ্যামনগর অঞ্চলের সামাজিক ও নৈতিক পরিবেশ বিনষ্ট করছেন বলে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে শম্বা গোস্বামী বলেন, আমার নামে কোন সংবাদ প্রকাশ করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। এরপর এ প্রতিবেদককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সংযোগ বিচ্ছন্ন করে দেন।


