
সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার অবকাঠামোগত উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কেবিএস প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন ২০২৬। তবে মেয়াদ শেষের আগমুহূর্তেও শতাধিক সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তিন জেলার লাখো মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে কেবিএস প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও সেই বর্ধিত সময়ও শেষ হতে চলেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, এখনও বহু উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতির কারণে কাজের গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার দেবহাটা এলাকায় বালু সংকটের কারণে সড়ক ও সেতুর কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নদী থেকে বালু উত্তোলনে বিধিনিষেধ থাকায় সময়মতো উপকরণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জ্বালানি খরচ ও বালুর সংকটে এখন কাজের এক-চতুর্থাংশ শেষ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।”
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালক মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য গোপন করে পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি সভায় মাত্র ১৬টি চলমান প্রকল্পের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। সেখানে জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে বাস্তবে তিন জেলায় প্রায় শতাধিক স্কিম এখনও চলমান রয়েছে।
খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রধান প্রকৌশলী বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন, তার জেলার অন্তত ১৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব নয়। একইভাবে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীরাও চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদন উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক নিজস্ব সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালক মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নির্বাহী প্রকৌশলীদের মতামত এবং জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিভিন্ন এলাকায় সড়ক খনন করে কাজ শুরু হলেও তা শেষ হয়নি। কোথাও সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ, কোথাও কালভার্ট নির্মাণ অর্ধেক অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুমের আগে এসব কাজ শেষ না হলে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মাদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এক ডিও পত্রে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের পত্র দিয়েছেন খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-৩ ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যরাও।
তাদের বক্তব্য, চলমান কাজ অসম্পূর্ণ রেখে প্রকল্প সমাপ্ত করা হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অভিযোগ রয়েছে, আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ রাখা ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ২০ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালকের নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
চলমান স্কিমের ঠিকাদাররা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিল উত্তোলন, কাজের অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
একজন ঠিকাদার বলেন, “সময় খুব কম, অথচ কাজ অনেক বাকি। কাজ শেষ না হলেও বিল নিতে গেলে জরিমানার ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে গেলেই চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়।”
সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান বলেন, “প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জেলায় এখনও অনেক স্কিমের কাজ চলমান রয়েছে। মেয়াদ বৃদ্ধি না হলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।”
খুলনা ও বাগেরহাটের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মুঠোফোনে বলেন, “আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।” পরে অনিয়ম ও চলমান প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ অবস্থায় স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা প্রকল্পের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত মেয়াদ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।