
সাতক্ষীরায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রওশন আরা রুবির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, প্রভাব বিস্তার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গোপন বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রওশন আরা রুবি।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারীরা আত্মগোপনে থাকলেও রওশন আরা রুবি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। ১৫ আগস্টকে ঘিরে প্রায় প্রতি রাতেই তার বাসায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাতক্ষীরা পৌর বিএনপির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রওশন আরা রুবির বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ সামনে আসে। এ নিয়ে একটি ভুক্তভোগী পরিবার জেলা বিএনপির কাছে অভিযোগ করলেও সেখানে রুবি উপস্থিত হয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, আমরা ভুক্তভোগীকে আদালতের পরামর্শ নিতে বলেছি। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, রুবি ওই জমির ওপর কোনো অধিকার না থাকা সত্ত্বেও তা জোরপূর্বক দখলে রেখেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পৌর ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা সজল আহমেদ বলেন, রওশন আরা রুবির বাসায় নিয়মিত গোপন বৈঠক হচ্ছে বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেত্রী হয়েও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন দাবি করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সদর উপজেলার শিমুলবাড়িয়া গ্রামের স্বপন দাশ অভিযোগ করে বলেন, বিলশিমুলবাড়িয়া মৌজায় তাদের ৪৭ শতক জমি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রুবি ওই সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করেছেন বলে অভিযোগ তার। একই এলাকায় আরও কয়েকজনের সম্পত্তিও দখল করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফিংড়ী এলাকার বিএনপি কর্মী আলমগীর হোসেন বলেন, বিলশিমুলবাড়িয়া এলাকায় রুবির একটি মৎস্যঘেরে প্রায়ই বৈঠক হয় বলে তারা খবর পেয়েছেন। দুর্গম এলাকায় হওয়ায় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বৈঠক হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে রওশন আরা রুবির চাচাতো দেবর প্রবাসী শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, দেবহাটা থানার বালিথা মৌজার ‘ধাপার ঘের’ এলাকায় তাদের ৮ দশমিক ১৫ একর পৈতৃক ও রেকর্ডভুক্ত সম্পত্তি রয়েছে। তার অভিযোগ, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রওশন আরা রুবি, তার ছেলে জায়েদ বিন কাদের ও তাদের সহযোগীরা ওই জমি দখল করে সেখানে মৎস্য চাষ শুরু করেন।
শরিফুল ইসলামের দাবি, ক্ষমতার প্রভাব ও ভয়ের কারণে এতদিন তারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি দেশে ফিরে চলতি বছরের ৩ জুলাই সকালে স্বজনদের নিয়ে ওই পৈতৃক জমিতে গেলে রওশন আরা রুবি, তার ছেলে জায়েদ বিন কাদের, মাহাফুজ সরদার, বনি আমিন ও আব্দুল আলিমসহ ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করা হলে বিষয়টি মীমাংসার জন্য দেবহাটা থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানান শরিফুল ইসলাম। এরপর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, সদস্য সচিব ও সাতক্ষীরা আদালতের জিপির উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বৈঠকেও রওশন আরা রুবি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে চলে যান।
অন্যদিকে, গত ৬ মে রওশন আরা রুবির ছেলে ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জায়েদ বিন কাদেরের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রানার জমি দখল করে ঘেরে থাকা কয়েক লাখ টাকার মাছ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন ভুক্তভোগী।
শহর বিএনপির এক কর্মীর দাবি, রওশন আরা রুবি তার স্বামী ফজলুর কাদেরের মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি শান্তিপূর্ণভাবে ভাগ-বাটোয়ারা করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি বিভিন্ন মানুষের জমি দখলসহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরা-২ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও কথা বলতে সাহস পেতেন না বলে দাবি করেন তিনি।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রওশন আরা রুবি। তিনি বলেন, আমার বাসায় কোনো গোপন মিটিং হয় না। আমি তো বাসাতেই থাকি না, ঢাকায় থাকি।কারও জমি দখলের অভিযোগও মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, “আমার ভাই জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত আছেন।”
এ বিষয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুর রহমান বলেন, রুবির গোপন বৈঠকের খবর আমাদের জানা নেই। আপনাদের জানা থাকলে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।


